আজ রবিবার, তাই এইসময়ে এখানে ভিড়টা একটু বেশি, এ কথাটা সুবলের জানা ছিল। এখানে অনেক ভিড় হয়, অনেকরকমের লোক আসবে-যাবে, এ কথাটা ভেবেই আজ সুবল এই চত্বরে এসে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। তার দৃঢ় বিশ্বাস হরিপদবাবুকে খুঁজে পেতে গেলে এমন সব ভিড়ের জায়গাতেই দেখতে হবে। উনি ঠিক পালিয়ে চলে যাওয়ার লোক নন। চারদিকের এই কোলাহলে এতটা কাছ থেকে দেখলেও লোকটাকে নিরবচ্ছিন্নভাবে দেখতে পাচ্ছে না সুবল। দু-জনার মাঝে ক্রমাগত কেউ-না-কেউ এসে গিয়ে সুবলের দৃষ্টি আড়াল করে দিচ্ছে। লোকটাকে চোখে চোখে রাখে সুবল। নিজের মনে সে নানা ফন্দি খেলাচ্ছে, কীভাবে আরেকটু কাছে গিয়ে হরিপদবাবুকে পাকড়াও করবে। তবে সে ভুল করতে চায় না। এর আগে একবার শিয়ালদায় সে মার খেতে খেতে বেঁচেছে অচেনা লোককে হরিপদ ভেবে পিছন থেকে জাপটে ধরে। আরেক বার, নন্দন থেকে সিনেমা দেখে বের হওয়া জনতার একজনের পিছু নেয় সে। সুবল শুনেছিল আচ্ছা আচ্ছা অপরাধীকেও যদি হঠাৎ পিছন থেকে অতর্কিতে তার নাম ধরে ডাকা যায়, তার শরীরী ভাষায় পরিবর্তন অনিবার্য। তাই পিছু নেওয়া লোকটার প্রায় ঘাড়ের কাছে পৌঁছে সে বার কয়েক বিভিন্ন পর্দায় স্বর খেলিয়ে ‘স্যার’ আর ‘হরিপদবাবু’ বলে ডেকেছিল। আশপাশের লোক একটু সচকিত হয়ে তার দিকে তাকালেও সামনের লোকটা ভ্রূক্ষেপ করেনি তার ডাকে। তবে আজ সুবল প্রায় নিশ্চিত, এ লোকটা হরিপদবাবু না হয়ে যায় না। সেদিন তার ভুল হয়ে থাকতে পারে– কিন্তু আজ সে নিশ্চিত, তাই অনেক আটঘাট বেঁধে এগোতে চায়।
অপেক্ষারত লোকটা নিজের চশমা চোখ থেকে খুলে পকেটের রুমাল দিয়ে ভালো করে মোছেন। চশমার ডিজাইনটা নতুন, হালফ্যাশানের, অমনটা হরিপদবাবু ব্যবহার করতেন না সুবলের মনে আছে। ‘তবে এতদিন কেটে গেছে, চশমা পালটে নেওয়া স্বাভাবিক’, সে ভাবে। সুবল লক্ষ করে দেখে মানুষটা ডান হাতে চশমাটা ধরে বাঁ-হাত দিয়ে মুছছেন। এমনটা সাধারণত বাঁ-হাতি মানুষ করে। ‘স্যার কি ল্যাটা ছিলেন’, সুবল একটু ধন্দে পড়ে যায়। ‘সই কিংবা লেখালেখি সবই তো করতেন ডান হাতে’– পুরোনো দিনের স্মৃতিতে ডুব দিয়ে সুবল প্রাণপণে চেষ্টা করে দৈনন্দিন কাজে হরিপদবাবুর দুই হাতের বিবিধ ব্যবহার স্মরণ করতে। চকিতে তার মনে ভেসে ওঠে হরিপদর সঙ্গে কাটানো দীর্ঘ কর্মজীবনের নানা দৃশ্যের কোলাজ। সেসব দৃশ্য নিজের মনে শব-ব্যবচ্ছেদের নিপুণতায় উলটেপালটে দেখে সে, যদি অন্তত একটা হিল্লে হয় এই ডান হাত বাঁ-হাত বিবাদের। একজন ভ্রাম্যমাণ হকার অনেকক্ষণ ধরে সুবলকে কিছু-একটা গছানোর চেষ্টা করছে। লোকটার একঘেয়ে সুরে নিজের জিনিসের গুণকীর্তন তাকে একাগ্র হতে দিচ্ছে না। সুবল মুহূর্তের জন্য নীলজামা লোকটার থেকে নজর সরিয়ে কাছঘেঁষে দাঁড়ানো হকারের দিকে কঠিন দৃষ্টিতে তাকায়। ততোধিক কঠিন গলায় তাকে সে যে কিছুই কিনতে চায় না, এ কথাটা জানিয়ে দেয়। এসব হকার খরিদ্দার চেনে, তাই সুবল সত্যি সত্যিই কিছু কিনবে না– এটা বুঝে দূরে সরে যায়। সুবল আবার তার দৃষ্টি উদ্দিষ্ট স্থানে নিক্ষেপ করে।
আজ প্রথম বার নয় যদিও। এর আগেও সে বেশ কয়েক বার হরিপদর দেখা পেয়েছে। মানে, বিভিন্ন জায়গায় লম্বা অপেক্ষার পর হঠাৎ কারও প্রতি চোখ পড়ায় অন্তত কিছুক্ষণের জন্য তার মনে হয়েছে যে অনেক খোঁজাখুঁজির পর অবশেষে তার এতদিনের যাচ্ঞা সার্থক হল বুঝি! এইবার বুঝি সে জেনে নিতে পারবে স্বয়ং হরিপদবাবুর থেকেই, তাঁর অমন হঠাৎ অন্তর্হিত হয়ে যাওয়ার পিছনে সঠিক কারণটা ঠিক কী। অফিসে সেই সময়ে অনেক গুজব রটেছিল, যেমনটা হয় এমন সব ঘটনার পরে। সেইসব গুজবের অধিকাংশই ছিল উদ্ভট, মাথামুন্ডুহীন রসালো চরিত্রহনন। হরিপদবাবুকে তারচেয়ে ভালো আর কে চেনে! যে লোকটা জীবনে কারও থেকে একগাছা সুতোও উপহার নেয়নি কখনও, তার নামে লোকে বলতে শুরু করল উনি নাকি নিয়মের বাইরে গিয়ে কাজ করিয়ে দেওয়ার লোভ দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা নিয়েছেন বিভিন্ন জনের কাছ থেকে আর তারপর স্রেফ উবে গেছেন সেই টাকা হজম করে ফেলে! অফিসে সবার সঙ্গে তঁার বনিবনা হচ্ছিল না তাই স্যার বাড়ি ছেড়ে, চাকরি ছেড়ে বিবাগি হয়েছেন– এমনটাও বলেছিল কেউ কেউ। তবে, মনে মনে সুবল দোষ দেয় নিজেকে। তার দৃঢ় ধারণা, যা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে এতগুলো বছর ধরে, হরিপদবাবু অমনভাবে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছেন স্রেফ তার জন্য। সে-ই আসলে একমাত্র দায়ী লোকটার অমনভাবে উবে যাওয়ার জন্য। আর তাই, সুবল তাঁকে খুঁজে ফিরছে এতদিন ধরে নানা জায়গায়। হরিপদবাবু কেন সব কিছু ছেড়ে এভাবে উধাও হয়ে গেলেন, সে কথাটা তঁার মুখ থেকে একবার না শুনলেই নয়।
যদিও, শেষে অনেকেই মেনে নিয়েছিল শেষদিকটায় হরিপদকে যেন একটু অচেনা ঠেকছিল– যেসব কথা বলতেন তিনি কখনো কখনো, তার মানে বোঝা দায় হয়ে দাঁড়াত। সে কথাটা অবশ্য সুবল মানে। আরে, সেসব কথা তো তিনি সবচেয়ে বেশি বলতেন তাকেই। সুবল মালতী ম্যাডামকেও আগাম জানিয়েছিল সাহেবের সেইসব অবাক করে দেওয়া কথাবার্তা। ম্যাডামের কথা মনে পড়ে যাওয়ায় সুবলের শরীরের প্রতিটি কোষ সচকিত হয়ে ওঠে সহসা। বুক আর পেটের ভিতর থেকে পাক খেয়ে ওঠে একটা অব্যক্ত অনুভূতি, যেন বিজাতীয় কিছু-একটা শরীরের ভিতর থেকে সব কিছু লন্ডভন্ড করে দিয়ে ওপরে উঠে আসতে চায়। যেন যা-কিছু সে নিজের ভিতরে ধারণ করে আছে এতদিন, তা উগরে দিলে পরেই তার নিষ্কৃতি… পুরোনো সব কিছু খসে গিয়ে নবজন্ম হবে তার এই মধ্যবয়সে।
হেমন্তের এই পড়ন্ত রোদ্দুরে চারদিকে লোকজনের প্রবল কোলাহলের মধ্যে এক্কেবারে একা-নির্বান্ধব সুবলের মনে পড়ে হরিপদর অন্তর্ধানের পর প্রায় দশ বছর কেটে গেল। প্রথমদিকটায় একটু হইচই হয়েছিল। একটা তদন্তও হয়েছিল সেই সময়, কর্তৃপক্ষের নির্দেশে– তবে তাতে কিছুই বোঝা গেল না। শুধু জানা গেল হরিপদবাবু একদিন গভীর রাতে বা ভোরসকালে নিরুদ্দেশ হয়ে যান। তিনি টাকাপয়সা, জামাকাপড় বা অন্য কিছুই সঙ্গে নিয়ে যাননি; সে কথাটাও পরিষ্কার বোঝা যায় সেই সময়। তারপর যেমনটা হয় এসব ক্ষেত্রে। অচিরেই লোকের আগ্রহ কমে যায়, একটু একটু করে স্মৃতি মলিন হয়ে ওঠে, তারা স্থান পায় মস্তিষ্কের ধূসর কোনও অংশে। হরিপদ তখন কেবলই ক্রমে ঝাপসা হয়ে আসা দু-চারখানা স্থিরচিত্রের কোলাজ মাত্র। কিন্তু, সুবলের জন্য ঠিক তেমনটা নয়। তার ক্ষেত্রে বিষয়টা ঠিক উলটো! যত দিন যাচ্ছে, হরিপদ তার মনে আরও বেশি করে জেঁকে বসছেন। হরিপদর অন্তর্ভেদী চোখজোড়া, তার ধীরস্থির প্রত্যয়ী অবয়ব, বাচনভঙ্গি, কথা বলার সময় এক বিশেষ ছন্দে দুই হাতের আন্দোলিত হতে থাকা... এইসব সুস্পষ্টভাবে সদা জেগে থাকে সুবলের মনে। দিনকে দিন সেইসব স্মৃতি যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে তার মনে। হরিপদ নিরুদ্দেশ হওয়ার পর সে আর তঁার বাড়িমুখো হয়নি কখনও। ম্যাডাম নিশ্চয় খুব আশ্চর্য হয়েছেন, দুঃখও পেয়েছেন হয়তো খুবই, তার এমত আচরণে। সুবল জানে একে অনৈতিক, দুর্ব্যবহার ছাড়া অন্য কিছু ভাবা দুষ্কর যে-কারও পক্ষে। তাই সে মনে মনে জানে, নিভৃতে, হয়তো-বা তঁাদের সেই দোতলার শোয়ার ঘর লাগোয়া স্নানঘরের দেয়ালজোড়া আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে থাকার সময় মালতীর অধর থেকে তার উদ্দেশে নিত্য ঝরে পড়ে অনেক নিঃশব্দ-চাপা, ভিতরে ভিতরে গুমরে ওঠা তিরস্কার যা সবই প্রগাঢ় অভিমানসঞ্জাত।
সেইসব গঞ্জনা তার প্রাপ্য, তা বিলক্ষণ জানে সুবল। কিন্তু সব কিছু অগ্রাহ্য করে গত দশ বছর সে আত্মমগ্ন হয়ে নিয়োজিত থেকেছে একটি মাত্র লক্ষ্যে। হরিপদকে খুঁজে বার করার জন্য প্রতিটি ছুটির দিন সে নিয়ম করে সেইসব জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায়, যেখানে তার বিশ্বাস একদিন-না-একদিন তার সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে হরিপদর। কখনও বড়ো ক্লাবের খেলার দিনে মাঠে, কখনো-বা ব্যস্ত স্টেশনে দূরপাল্লার মেল ট্রেন ছেড়ে যাওয়ার আগে প্ল্যাটফর্মে, অলিগলি-রাজপথে, মন্দিরে-মসজিদে সহস্র ভক্তের ভিড়ে... সে খুঁজে ফেরে হরিপদকে। যদি কোথাও তার চোখ পড়ে যায় হরিপদর মতো কারও দিকে, সে তার পিছু নেয়, তাকে অনুসরণ করে শ্বাপদের একাগ্রতায়। হরেককিসিমের মানুষের ভিড়ের মধ্যে সে একাকী ঘুরে বেড়ায় বিকারগ্রস্ত মানুষের মতো। তার চোখজোড়া শিকারির মতো খুঁজে ফেরে জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া পুরোনো মানুষটাকে। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নীলচে জামার লোকটার দিকে তাকিয়ে যখন আঁতিপাঁতি করে মিল খুঁজছে, এমন সময় তার ঘোর কাটে আকস্মিক সুরেলা শব্দে। প্রথমে সুবল বুঝতে পারে না এই শব্দটা কোথা থেকে আসছে। তার মনঃসংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে নীলচে জামার লোকটার থেকে। আশ্চর্য হয়ে সে শোনে তারই শরীরের কাছেই কোথাও থেকে বেজে ওঠা সুরেলা সেই শব্দ।
একটু ধাতস্থ হয়ে সে বোঝে এ আওয়াজ আসছে তার পকেট থেকে, এ তার নিজের মোবাইল ফোনের রিংটোন! আজকাল তার বাড়িতে মন টেকে না, প্রতি সপ্তাহান্তে সে এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়ায়– তাই অতসী তাকে বাধ্য করেছে একটা মোবাইল ফোন নিতে। খানিকটা দাম কমলে জিনিসটা এখনও বেশ মহার্ঘ। তবে আজকাল ফোন অন্য কেউ করলে আর টাকা লাগে না, শুধুমাত্র সে নিজে ফোন করলে টাকা লাগবে এটা তাকে বার বার বলার পর সে রাজি হয়েছে যন্ত্রটা সঙ্গে রাখতে। তবে তাকে আর কে ফোন করবে তাই যন্ত্রটা নিশ্চুপ ছিল এতকাল। অনভ্যস্ত হাতে ফোনের বোতাম টিপে নিজের কানে চেপে ধরে সুবল। বহু যুগের ওপার থেকে ভেসে আসে চেনা কণ্ঠস্বর।
“সুবলদা, ম্যাডাম চেয়েছেন একবার যদি পারো তবে তঁার বাড়িতে এসো। বিশেষ দরকার তোমার সঙ্গে।”
সাহেবের পুরোনো দিনের ড্রাইভার আব্দুলের গলায় মালতীর কথা শুনে বিহ্বল হয় সুবল, তার মন নিমেষে ফিরে যায় গাছগাছালিতে ঘেরা কলকাতার উপকণ্ঠে অনেক মমতায় তৈরি নিঝুম বাড়িটার চৌহদ্দিতে।
॥ দুই ॥
লোহার রেলিং-এর দু-পাল্লার গেটে ভিতর দিকে হাত গলিয়ে হুড়কো খুলে ফেলা যায়। এটা সে জানে ইদানীং। খোলা গেট ঠেলে বাড়ির চৌহদ্দিতে ঢোকার সময় সুবল বার দুয়েক জোরে জোরে শ্বাস নিল। চারিদিক ম-ম করছে পাকা তেঁতুলের গন্ধে। বাগানের একপ্রান্তে এই গাছটা স্যারের নিজের হাতে লাগানো, এ কথা সে শুনেছে স্যারের মুখেই। এ বাড়ির এত গাছগাছড়া সবই তাঁর নিজের হাতে লাগানো। এসব গাছেদের কথা বলার সময় তাঁর চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, যেন বিশ্বসংসারে এদের চেয়ে কাছের আর কেউ নেই তাঁর। বাড়িতে বউ-ছেলে নিয়ে ভরাসংসার তাঁর কিন্তু এই গাছগাছড়া-লতাপাতারাই তাঁর নিকটাত্মীয়। এসব নিয়ে একটা মৃদু হাসিঠাট্টাও হয় তাঁর পিছনে, অধস্তনদের মধ্যে। কখনো কখনো সুবল নিজেও সেইসব লঘু চাপল্যে শামিল হয়েছে কিন্তু এই মুহূর্তে ওই গাছ থেকে ভেসে আসা পাকা তেঁতুলের ঘ্রাণ তাকে বিবশ করে তুলল কয়েক মুহূর্তের জন্য। আজ ম্যাডাম ডেকে পাঠিয়েছেন বিশেষ কাজে। ফোনে শুধু এইটুকুই শুনেছিল। তবে এর চেয়ে বেশি কথা তিনি বলেন না কখনও, অন্তত ফোনে তো নয়ই। আর তঁার এইটুকু কথাই যথেষ্ট সুবলের কাছে। এরচেয়ে বেশি কীই-বা সে চাইতে পারে তঁার থেকে। গেট থেকে বাড়ির সদর দরজার মধ্যে জমিটুকু মেরে-কেটে ত্রিশ ফুট হবে হয়তো। কিন্তু সেই দূরত্বটুকু সুবলের কাছে অনতিক্রম্য ঠেকে আজকাল যখনই সে এ বাড়িতে আসে এমন ফোন পেয়ে। ত্রিশ ফুট কীভাবে যেন কয়েক যোজন হয়ে দাঁড়ায় তার মনে। সে জানে এই দূরত্ব অতিক্রম করার সময় পথপার্শ্বে সে ফেলে যাচ্ছে নানা সম্পর্কের মৃতদেহ, সামাজিক ধারণা আর বাধানিষেধ।
আজও এই মুলাকাত শুরু হবে চেনা ছকে। মালতী একটি পূর্বনির্ধারিত গতে বেঁধে রাখেন এইসব অভিসারের দিনগুলিকে। অসম্ভব পারদর্শিতায় নির্মাণ করেন আপাত স্বাভাবিকতা। যেন সুবলের এই সময়ে, নির্জন এই দুপুরে নিরালা এই বাড়িতে তঁার সঙ্গে দেখা করতে আসাটা পৃথিবীর সাধারণতম ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি। এইসব সময়ে তঁার ব্যবহারে কোনও তাড়া নেই, নেই কোনও বিশেষ উত্তেজনা। বাড়িতে আসা আর-দশটা অতিথির মতো সুবলের সঙ্গে তিনি দু-দশটা সাধারণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন, খবরাখবর নেন বাড়ির, অফিসের। তারপর, কিছুক্ষণ পর যখন সত্যিসত্যিই সুবলের মনে ধন্দ জাগে, ‘কী এমন বিশেষ কাজে উনি আজ ডেকে পাঠালেন’, আলোচনা অন্য দিকে মোড় নেয়। অফিসের সাধারণ আলোচনার প্রসঙ্গ ধরে অবধারিতভাবে উপস্থিত হন তাঁর স্বামী, হরিপদ মানে সুবলের ‘স্যার’। এবার মালতী জানতে চাইবেন সত্যিই কি হরিপদ পালটে যাচ্ছেন? আজকাল কী নিয়ে ডুবে থাকেন তিনি? বার বার নিজেকে কী বলেন সবার অগোচরে?
কিছুদিন আগে সুবলই প্রথম মালতীকে জানিয়েছিল তার শঙ্কার কথা। বলেছিল স্যারের হাবভাব তার কাছে ভালো ঠেকছে না। সুবল জানিয়েছিল হরিপদ প্রায়ই ফাঁকা রাস্তায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে ধু-ধু মাঠের দিকে তাকিয়ে থাকেন। সেইসব সময়ে তঁার চোখে থাকে এক অসীম শূন্যতা। তিনি বিড়বিড় করেন, বলেন– অপেক্ষা করছেন, বড়ো কোনও পরিবর্তনের জন্য। তিনি জানেন তাঁর জীবন এখন দাঁড়িয়ে আছে এক সন্ধিক্ষণে; যেখান থেকে সব কিছু পালটে যাবে। ম্যাজিকের সময় আগত, শুধু চোখ-কান খোলা রাখতে হবে। তবে মালতীর সঙ্গে হরিপদবাবুর এমনভাবে পালটে যাওয়ার কথা তার প্রথম বার হয়েছিল এমনই এক দুপুরে, আরও নিভৃত গৃহ-অন্দরে, মালতী এবং হরিপদর শোবার ঘরের বিছানায়, পূর্বরাগকালের কথোপকথনের সময়। সুবলের মনে আছে মালতীর সঙ্গে দেখা হওয়ার প্রথমদিকের কথা। এ কথা সত্য সেসময়ে নিজের চাপা স্বভাবের বাইরে গিয়ে প্রথমে সে-ই এগিয়েছিল তঁার দিকে, খানিকটা বেপরোয়াভাবে, এক নিষিদ্ধ অচেনা উত্তেজনায়। তার মনে হয়েছিল জীবনে অন্তত একবার বেপরোয়া বিন্দাস হওয়ার অধিকার সবার আছে। এমনকি তারও। মালতী মেনে নিয়েছিলেন, প্রশ্রয় দিয়েছিলেন তাকে। কিন্তু প্রাথমিক সেই সমর্পণের রেশ কেটে গেল অচিরেই। তাদের মধ্যে তৈরি হওয়া সম্পর্কের সবটুকু সুতো শক্ত করে হাতে নিয়ে নিলেন মালতী আর সুবল একটু একটু করে ডুবতে শুরু করল অকূল দ্বিধায়।
দু-রকমের টান আছে এই ডুবে যাওয়ায়। মালতীর গোপন সান্নিধ্য তাকে টানে। গভীরভাবে টানে। এ বাড়ির ওই শোয়ার ঘরে মালতীর সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত তার কাছে নতুন ভূগোল আবিষ্কারের উত্তেজনা-সম। প্রতিটি অভিসারপর্বের শেষে সুবলের মনে শুরু হয় নতুন করে পল গোনা। আবার কবে আসবে সেই ডাক যখন এই নিরালায় একাকী সে অতিক্রম করবে যোজনসম ওই ত্রিশ ফুট ভূখণ্ড। এতোল-বেতোল কিছু বাক্যালাপের পর আবার কবে তারা মিলিত হবে আদিম গহনে। আবার কবে আসবে সেই ক্ষণ যখন শীৎকার-আশ্লেষ, শরীরের সব গ্রন্থির থেকে ক্ষরিত স্বেদ, নাগাড়ে বেড়ে চলা হৃৎপিণ্ডের দুরন্ত রফতার তাদের আরও একবার পৌঁছে দেবে পৃথিবীর শেষবিন্দুতে। আবার, যখন সে হরিপদবাবুর মুখোমুখি হয়, এক অন্তহীন অপরাধবোধ তাকে নুইয়ে দেয়, যেন কালো অনন্ত জলরাশির আরও গভীরে কেউ ঠেলে দেয় তাকে। ইদানীং হরিপদবাবুর মুখে সে দু-এক বার আলগোছে বলা ছেঁড়া ছেঁড়া বাক্যে কোনো-এক অতলান্ত দিঘির আভাস পেয়েছে। মায়াবী এক দিঘি যা নিজের পাড়ে আশ্রয় দেয় বিশেষ বিশেষ মানুষকে, প্রশ্রয় পেয়ে সেইসব মানুষ গাছ হয়ে ওঠে। ইদানীং হরিপদবাবুর সান্নিধ্যে মাঝে মাঝে সে-ও যেন এক ঝলক দেখা পায় সেই দিঘির। এই দুই টানের মাঝে যাপন তার। ধীরে ধীরে তার জিবের ডগায় জমা হচ্ছে নানা বাক্য। সে চায় সেসব বাক্য যথাযথ সময়ে মালতীকে বলতে। বেশ কিছু বাক্য জমে আছে হরিপদর জন্যও। কিন্তু সেসব কোনও কিছুই আর তার বলা হয় না কারোকে। সেইসব কথা কিছুদিন জমে থাকার পর মুখ থেকে নিঃসৃত না হতে পেরে গলা বেয়ে নেমে যায় শরীরের গভীরে। সেখানে শরীরের নানা রসে জারিত হয়ে সেইসব বাক্য ভেঙে খানখান হয়, গলে-পচে পালটে যায় এক্কেবারে। অর্থহীন টুকরো-টাকরা কিছু স্বরবর্ণ আর ব্যঞ্জনবর্ণ আটকে থাকে পাঁজরের খাঁজে, ফুসফুসের আশপাশে। শ্বাস নেওয়া ক্রমে দুষ্কর হয়ে ওঠে সুবলের জন্য। ক্ষুদ্রান্ত্র-বৃহদান্ত্র-প্লীহা-যকৃৎ ঢাকা পড়ে যায় নানাবিধ শব্দের গলিত মৃতদেহে। সুবল বোঝে ক্রমেই তার শরীর হয়ে উঠছে অকালমৃত বা না-জন্মানো বাক্যদের বেওয়ারিশ লাশের ভাগাড়।
হরিপদবাবু আজ কলকাতায় নেই, সে কথা সুবলের জানা ছিল। মালতীর মুখে সে শুনল তাদের একমাত্র পুত্রও শহরে অনুপস্থিত আজ, স্কুল থেকে কোনও শিক্ষামূলক ভ্রমণ-এর ব্যবস্থা করা হয়েছে ইচ্ছুক ছাত্রদের জন্য। স্যমন্তকের বিশেষ একটা ইচ্ছা ছিল না কিন্তু মালতী জানালেন তিনিই ওকে খানিকটা জোর করে পাঠিয়েছেন।
“স্কুলের বাইরে সবার সঙ্গে একটু মেলামেশা করার এই সুযোগ, বাড়ির বাইরে নিজের দায়িত্ব নিজে নিতে শেখার চেষ্টা; এসব ভালো অভ্যাস, আমি বুঝিয়েছিলাম সমুকে।”
তাকে বলা এই কথার সূত্রে সুবলের মনে ধন্দ চেপে বসে আরও। ‘আজ কি সত্যিই কোনও বিশেষ দরকার আছে ম্যাডামের, নয়তো এমন একটা দিন তিনি কেন বেছেছেন? শুধুই তার সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য?’ মনে মনে ভাবে সুবল। লম্বা সময় তার সঙ্গে মালতী কাটাতে চান না, সে কথা সুবল আগে টের পেয়েছে। একবার, সেদিন সে হরিপদবাবু বাড়িতে থাকাকালীন এসেছিল, তঁারই নির্দেশে, অফিসের নানা কাজ নিয়ে। সেসব দিনে তার সঙ্গে ম্যাডামের ব্যবহার অন্যরকম; স্বামীর অধস্তন কর্মচারীর সঙ্গে যেমন হওয়া উচিত, ঠিক তেমনই মানানসই। সুবল থাকাকালীন তিনি একবার আসেন একতলার একপাশের বিচ্ছিন্ন ঘরটাতে, যেখানে হরিপদবাবু নিজের কাজ সারেন। মালতী এসে নিয়মমাফিক সুবলের কুশল জানতে চান এবং দু-একটা বাক্যবিনিময়ের পর ‘তোমরা নিজেদের কাজ করো, আমি ভিতরে যাই, অনেক কাজ পড়ে আছে’, জানিয়ে উঠে পড়েন। সেদিন ম্যাডাম উঠে যাওয়ার ঠিক আগে স্যার টেবিলের কাগজ থেকে চোখ তুলে তাকালেন তাঁর দিকে। সুবলের সেই দৃশ্য হুবহু মনে আছে আজও। হরিপদবাবু মালতীকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন তিনি বাড়িতে একা থাকতে থাকতে হাঁপিয়ে উঠছেন কি না। এরপর খানিক পরামর্শ দেওয়ার ভঙ্গিতে রেখেছিলেন একটি প্রস্তাব।
“যদি চাও তো দিন দুয়েক কাছাকাছি কোথাও ঘুরে আসতে পারো। সুবল করিতকর্মা ছেলে, ও সব ব্যবস্থা করে দেবে।”
মালতী কোনও জবাব না দিয়ে উঠে গিয়েছিলেন কিন্তু দরজার কাছে পৌঁছে, কী মনে হওয়াতে একবার থামলেন সেদিন। ঘুরে হরিপদ এবং সুবল, দু-জনের দিকেই আলাদাভাবে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে জানিয়েছিলেন তিনি স্বাবলম্বী, নিজের ব্যবস্থা নিজে করে নিতে জানেন। হরিপদবাবু বিনা বাক্যব্যয়ে আবার কাগজে মনোনিবেশ করেছিলেন সেদিন।
আজ আপাতত অফিস নিয়ে মালতীর মনে জমে থাকা সব প্রশ্ন শেষ হয়েছে। হরিপদবাবু সম্পর্কেও সুবলের থেকে আজ আর কোনও নতুন কথা শোনা বাকি নেই, সেটাও বুঝেছেন তিনি। সুবল আসার আগে থেকেই সামনের সেন্টার টেবিলে সাজানো ছিল নানা খাদ্যদ্রব্য। সেসব যেমনকার তেমনই রয়ে গেছে আজ। তঁার মন কোনো-এক কারণে আজ একটু উচাটন, এটা সুবল আন্দাজ করতে পারে। তাই সে একধরনের অনিশ্চয়তায় ভোগে ভিতরে ভিতরে। তার মনে প্রশ্ন জাগে মালতীর সঙ্গে কথাবার্তা যেহেতু শেষ হয়েছে, আজকের মতো তঁার থেকে বিদায় নিয়ে উঠে পড়লে কেমন হয়। কিন্তু আবার তার মন-গভীরে আরেক জন আছে যে এই অভিসারকে এভাবে বিফলে যেতে দিতে চায় না। ভিতরের সেই লোকটা যারপরনাই উত্তেজিত, আর কিছুক্ষণ পর কী হতে চলেছে সে কথা ভেবে। অবশেষে আসে সেই মুহূর্ত। মালতী চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। ভিতরবাড়ির দিকে পা বাড়াতে গিয়ে সুবলকে জানান তাঁদের শোবার ঘরে খাটের পাশের ছোটো টেবিলে রাখা সুদৃশ্য টেবিল ল্যাম্পের বাল্ব না-জ্বলার কথা। সুবল কি একটু দেখে দিতে পারে? সুবল ত্রস্ত হয় মনে মনে, না-জানা কারণে। তার গভীরে বাস করা অন্য জন তড়াক করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়।
“এ আর এমন কী, চলুন আমি ঠিক করে দিচ্ছি।”
॥ তিন ॥
আব্দুল ফোনে প্রথমেই জানাল সে সুবলের বাড়িতে ফোন করে তার খোঁজ করে। “জরুরি দরকার আছে”, এ কথা শুনে অতসী তাকে এই নম্বর দিয়েছে। অনেক দিন পর কথা হলে আগ্রহ না থাকলেও লোকে কুশলসংবাদ জানতে চায়। তবে, আব্দুল সেসব জানতে না চেয়ে সোজা কাজের কথায় এল। তাতে অবশ্য সুবল অবাক হয়নি, সে আব্দুলকে চেনে আজ অনেক দিন, জানে তার মনটা ভালো। একসঙ্গে অনেক দিন একই জায়গায় কাজ করেছে তারা– তাই সেদিন সুবল তার কথায় পুরোনো দিনের মতোই আন্তরিকতার ছোঁয়া পেয়েছিল। ও ছিল স্যারের ড্রাইভার, সর্বক্ষণের সঙ্গী। নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার আগে হরিপদ যে একটু কেমন একটা হয়ে যাচ্ছিলেন তা সবচেয়ে প্রথমে
বোঝে আব্দুলই।
সে-ই জানিয়েছিল সুবলকে, প্রথমে। পরে অবশ্য সুবলও টের পাচ্ছিল খানিকটা, তাই ম্যাডামকে জানিয়েছিল সে কথা।
আব্দুলের ফোন পেয়ে সুবল একটু শঙ্কিত হয় প্রথমে। হরিপদ চলে যাওয়ার পর থেকে তার ভেতরে সদা জেগে থাকে একটা বড়ো প্রশ্ন। হরিপদ অমনভাবে চলে গেলেন কেন? তাঁর এই নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার পিছনে কখনো কখনো সুবল নিজের হাত দেখতে পায়। সে ভাবে, হরিপদবাবু নিশ্চয় জেনেছিলেন মালতীর সঙ্গে তার সম্পর্কের ব্যাপারে। তবে কি সেটাই তাঁকে বাধ্য করেছিল ওভাবে সবার চোখের আড়ালে চলে যেতে? আজকাল তাই নতুন কোনও কিছুতেই সুবল একটু চমকে চমকে ওঠে। তার মনে হয় অচিরেই শুরু হবে হরিপদবাবু-রহস্য নিয়ে আলোচনা আর আসলে সবাই তার থেকেই জানতে চাইবে যে সে ঠিক কী জানে। সেদিন শুরুতেই আব্দুল ম্যাডামের একটা নতুন নম্বর দিয়েছিল তাকে। তঁাদের বাড়ির একতলায় থাকা ফোনটার নম্বর সুবলের এখনও কণ্ঠস্থ, কিন্তু এটি তারই মতো মোবাইল ফোনের নম্বর। আব্দুল বলেছিল অতবড়ো বাড়িতে মালতী দিনের বেশিরভাগ সময়টা একা থাকেন, ওপর-নীচ করতে অসুবিধা হয় তাই আজকাল তিনি এই ফোনটা সঙ্গে রাখেন। উনি বিশেষভাবে জানিয়েছেন যে সুবল যেন সেই ফোনেই তঁার সঙ্গে যোগাযোগ করে নেয়। সম্ভব হলে সত্বর। এরপর আব্দুল নানা কথা বলছিল ফোনের ওপার থেকে; যেমনটা লোকে বলে পুরোনো পরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে অনেক দিন পর আবার যোগাযোগ হলে, কিন্তু সেইসব কথা সুবলের কাছে অর্থহীন ঠেকছিল। তার সারাটা মনজুড়ে শুধু বার বার ভেসে উঠছিল মালতীর সঙ্গে কাটানো সময়ের নানা খণ্ডচিত্র। আব্দুলের সঙ্গে কথা বলতে বলতে সুবল লক্ষ করেছিল নীলচে জামা পরা লোকটার সঙ্গে এসে কথা বলল আরেক জন মানুষ। এরই অপেক্ষায় লোকটা দাঁড়িয়ে ছিল সম্ভবত। স্বল্প বাক্যালাপের পর তারা দু-জন চলে গেল চৌরঙ্গি রোডের দিকে। সুবলের কাছে সেই সময়ে লোকটাকে আর হরিপদবাবুর মতো দেখতে লাগছিল না।
সেদিন রাতে খাওয়ার পর কিছুক্ষণ দোনামোনা করে, ঠিক শুতে যাওয়ার আগে সুবল অতসীকে বলেছিল আব্দুলের ফোন করার কথা। অতসী মৃদুকণ্ঠে জানিয়েছিল, আব্দুল বেশ কয়েক বার বাড়িতে ফোন করে সুবলকে না পাওয়ার পর সে তাকে সুবলের এই নতুন নম্বর দেয়।
“কী করি বলো, চেনা লোকটা বার বার বলছিল জরুরি কথা আছে। তোমাকে ছুটির দিনে বাড়িতে পাওয়া মুশকিল তার পক্ষে, তাই নম্বরটা দিতে বাধ্য হলাম।”
অতসীর গলায় তার ছুটির দিনে বাড়িতে না থেকে এদিক-ওদিক ঘুরে বেরিয়ে সময় নষ্ট করার জন্য অসন্তোষ টের পায় সুবল। সে জানে অতসী ক্ষুব্ধ তার এভাবে পালটে যাওয়াতে। সে বহুবার বলেছে, যিনি চলে গেছেন, তঁার জন্য এভাবে সময় নষ্ট করা বোকামি– পাগলামি একধরনের। তাঁর বাড়ির বাকি মানুষ যদি সেটা স্বীকার করে নিয়ে এগিয়ে গিয়ে থাকে তবে সুবলের এই প্রাণপাত করার অর্থ ঠিক কী? এ প্রশ্নের কোনও জবাব নেই সুবলের কাছে। অতসীও জবাবের আশায় এ কথা জিজ্ঞাসা করেনি কখনও। তবে এতদিন কেটে যাওয়ার পর এটাই এখন স্বাভাবিক ঠেকে তাদের দু-জনার কাছে।
কী বিশেষ দরকারে আব্দুল তার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিল তা অতসী নিজে থেকে জিজ্ঞাসা করে জানতে চায় না সুবলের থেকে। কিন্তু সুবল জানে মনে মনে অতসী অপেক্ষা করছে সুবল সেই ফোন করার কারণ সম্পর্কে কী
বলে তা শুনতে। কথাটা সুবল আলগোছে ভাসিয়ে দেয় বিছানায় মশারি গুঁজতে গুঁজতে।
“আব্দুল বলছিল মালতী ম্যাডাম একবার দেখা করতে বলেছেন। বিশেষ কিছু দরকার আছে ওঁর। দেখি, একদিন সময় করে ঘুরে আসব নাহয়। যতই হোক, স্যারের স্ত্রী, একধরনের দায়িত্ব আছে আমাদের।”
সুবল মশারির ভেতর থেকে আড়চোখে চেয়ে দেখে স্ত্রীর দিকে। বিছানায় শুতে আসার আগে অতসী এখন প্রাত্যহিক টুকিটাকি কাজে ব্যস্ত। একটু অগোছালো ঘরটাকে গুছিয়ে না ফেললে তার ঘুম আসবে না। ব্যবহারের পর ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখা প্রসাধনীসমেত বিভিন্ন জিনিসকে একটু গুছিয়ে রাখছে সে। এরপর পাট করে রাখবে ব্যবহৃত জামাকাপড়। এ তার দৈনন্দিন রুটিন, সুবল জানে অতসীর বিছানায় আসতে আরও ঘণ্টা খানেক বাকি। ততক্ষণে সুবল ঘুমিয়ে পড়বে বা স্থির হয়ে শুয়ে, চোখ বন্ধ রেখে ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা করবে। তাই আব্দুলের ফোন করার কারণ অতসীকে বলে রাখার এইটাই শ্রেষ্ঠ সময়, বোঝে সে। সে জানে এখন এই নিয়ে কোনও আলোচনা শুরু করতে চাইবে না অতসী।
অতসীর সঙ্গে সংসারের এক্কেবারে সাধারণ কথা ছাড়া অন্য যে-কোনো বিষয়ে সে আলোচনা এড়িয়ে চলে, হরিপদবাবু নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার পর থেকে। তার নিজের চরিত্রের এই সাম্প্রতিক অদ্ভুত দুর্বলতা তাকে নিজেকেই অবাক করে! সেই সময়ে, যখন সে মালতীর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে সম্পর্কে, তার মনে বিশেষ কোনও ভয়ডর ছিল না অতসীকে নিয়ে। কাউকেই, এমনকি হরিপদকে নিয়েও সে বিচলিত ছিল না সেই সময়ে। এমনই টান ছিল সেই নিষিদ্ধ অভিসারের। অথচ সেই সময়ই তার অনেক বেশি সতর্ক থাকার প্রয়োজন ছিল। হরিপদবাবুর নাকের ডগায় সে দিনের-পর-দিন লুকিয়ে-চুরিয়ে গিয়েছে তাঁর বাড়িতে, তাঁর অবর্তমানে! কিন্তু যখন হরিপদ আর থাকলেন না, যখন মালতীর সঙ্গে তার সম্পর্ক হয়ে দাঁড়াল অতীতের অ্যালবামের ধূসর এক চিত্রমাত্র, যখন আসলে তার মনে হওয়ার কথা যে সেইসব বিচ্যুতির জন্য আর তাকে কারও কাছে জবাবদিহি করতে হবে না, সুবলের মনে এসে বাসা বাঁধল দ্বিধা আর কুণ্ঠা। হয়তো-বা খানিকটা ভয়ও। সে নিজেকে মনে মনে অপরাধী ঠাওরাল হরিপদর এমত আচরণের জন্য। তার এখুনি বলা বাক্যের মধ্যে সে ‘আমাদের’ শব্দটা ব্যবহার করেছে অনেক ভেবে-চিন্তে। সে জানে অতসীর নারীমন স্বভাবতই দুর্বল হবে অপর এক নারীর প্রতি, বিশেষত সে নারী যদি একভাবে পরিচিত এবং দুঃখিনী হয়। সুবল চাইছিল মালতীর সঙ্গে আবার দেখা করতে যাওয়ার আগে অতসীর সমর্থন জোটাতে। যেন, খানিকটা অতসীর কথাতেই সে না-হয় একবার গিয়ে বুঝে আসবে কী বিশেষ কাজে মালতী ডেকেছেন তাকে।
আব্দুল তাকে মালতীর নতুন নম্বর দিয়েছে, বিশেষভাবে মনে করিয়ে দিয়েছে যে মালতী চান সে যেন ওই নম্বরেই ফোন করে যোগাযোগ করে, সে বক্তব্যটুকু সুবল সুকৌশলে বাদ দিয়েছে অতসীকে বলা কথা থেকে। হরিপদ উধাও হওয়ার পর থেকে যে দুশ্চিন্তা তাকে প্রায়শই পেড়ে ফেলে, কখনও গভীর রাতে দুঃস্বপ্নে, কখনো-বা অতর্কিতে, অফিসে কাজের ফাঁকে, তা হল অতসী এবং মালতীর যোগাযোগ। সে প্রায়ই দুঃস্বপ্নে দেখে তার জীবনের দুই নারী তাকে একযোগে জিজ্ঞাসা করছে হরিপদ কেন এমনটা করল তা সে জানে কি না। একই দৃশ্য বিভিন্ন আঙ্গিকে বার বার ফিরে আসে তার স্বপ্নে। কখনও দেখে সে ফিরে গেছে মালতী-হরিপদর সাধের বিছানায়। সংগমের চূড়ান্ত মুহূর্তে অতসী এসে দাঁড়ায় সেই বিছানার পাশে। খাটের ছত্রি ধরে দাঁড়িয়ে থাকা অতসী আর বিছানায় তার আলিঙ্গনে আবদ্ধ থাকা মালতী সমস্বরে তাকে জিজ্ঞাস করে হরিপদ ঠিক গেলেন কোথায়। কখনো কখনো সে মালতীকে দেখেছে তার নিজের বাড়িতে, অতসীর সঙ্গে গভীর চুম্বনে রত। তাদের অলক্ষে সে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে তা বোঝামাত্র দুই নারী একসঙ্গে তাকে জিজ্ঞাসা করে সেই একই প্রশ্ন। হরিপদ... হরিপদ... হরিপদ... গত কয়েক বছরে অগুনতি বার সুবল এই স্বপ্ন দেখেছে। ভিন্ন ভিন্ন রূপে। মালতী, অতসী ও সে। হাটে-বাজারে, অন্দরে-নিভৃতে। তাদের তিন জনের মধ্যে দু-জন যখন একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে রত, তৃতীয় জনের আবির্ভাব হয় সেখানে। আর প্রত্যেক বারই সেই রমণকে বিপর্যস্ত করে দুই নারী একসঙ্গে তার থেকে জানতে চায় হরিপদ-অন্তর্ধান রহস্য। যদিও তার স্মরণে নেই অতসীর সঙ্গে মালতীর আসলে কখনও দেখা হয়েছে কি না। সম্ভবত অতসী ও মালতী কখনোই একে অপরকে দেখেনি, আলাপ হয়নি তাদের মধ্যে। সেইকালে মালতী কখনও তার থেকে অতসী সম্পর্কে কিছুই জানতে চাননি। কিন্তু এখন, নিরুদ্দেশ-উত্তর পর্বে তার স্বপনে-শয়নে-জাগরণে এই দুই নারী থাকে একতাবদ্ধ হয়ে। অতসীর থেকে একবার আবার মালতীর সঙ্গে দেখা করে আসার জন্য একটি সম্মতিসূচক বাক্য বা শব্দের অপেক্ষারত শায়িত সুবলের চোখে অবশেষে আজকের মতো ঘুম নেমে আসে। ঘর অন্ধকার করে অতসী তখন তার কাছাকাছি এসেছে সবেমাত্র।
॥ চার ॥
দিন দুয়েক ইতস্তত করার পর সুবল শেষমেশ আব্দুলের দেওয়া নম্বর টিপল নিজের ফোনের বোতামগুলোতে। ফোনের পর্দায় ভেসে ওঠা সংখ্যাগুলোর দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে সুবল। বোঝার চেষ্টা করে পর্দার এই সংখ্যাগুলো আবার তার জীবন পালটে দেবে কি না। খানিকটা অপেক্ষা করে সে ডান দিকে, তলার দিকে ‘কল’ লেখা বোতামে চাপ দিয়ে কানে চেপে ধরে যন্ত্রখানা। বার তিনেক রিং হওয়ার পর মালতীর কণ্ঠস্বর ভেসে আসে তার কানে, ইথারবাহিত সেই স্বরের সঙ্গে যেন বহুযুগের ওপার থেকে স্মৃতি-সুনামি ধেয়ে এল তার দিকে। সুবল চকিত হয় মালতী ফোনে সরাসরি তাকে সম্বোধন করায়। তার ধারণা ছিল মালতী জিজ্ঞাসা করবে ফোনের ওপারে কে এবং সে নিজেকে পেশ করার জন্য কয়েক মুহূর্ত সময় পাবে। সে বোঝে আব্দুল তার নম্বরও মালতীকে দিয়েছিল। চাইলেই মালতী তাকে নিজেই ফোন করে নিতে পারতেন কিন্তু সেই পুরোনো সময়ের মতো আজও মালতী চান সম্পর্কের দিকনির্দেশ করবেন তিনিই। তাঁরই ইচ্ছা অনুসারে ঘটবে যাবতীয় ঘটনা। তিনি চেয়েছেন এতদিন পর আবার সুবলই যোগাযোগ করুক তাঁর সঙ্গে। ফোনে ভেসে আসা তাঁর স্বর অতীব নিরুদ্েবগ, কেজো। সহজেই কাজের কথায় আসেন মালতী। কিছুদিনের মধ্যে তাঁর বাড়িতে বড়ো উৎসব, তাঁদের একমাত্র সন্তানের বিবাহ। এই সময়ে তাঁর সুবলের কিছু সাহায্য প্রয়োজন। সুবল যদি একবার সপ্তাহশেষে তাঁর সঙ্গে এসে দেখা করতে পারে তবে ভালো হয়। সুবলকে বিশেষ সময় না দিয়ে “তবে ওই কথাই রইল, শনিবার বেলা বারোটা নাগদ একবার এসো”, বলে মালতী নিজের বক্তব্য শেষ করেন। সুবল একটা শেষ চেষ্টা করে বোঝার, মালতীর সঙ্গে তার কাজটা ঠিক কী।
“উৎসবের বাড়ি, কত কাজই তো থাকে সুবল। আমার আর লোক কোথায়, যে ছিল সে-ও চলে গেল না বলে-কয়ে, একবারও ভাবল না এতে আমাদের কী হবে। এসো সেদিন, বিশদে বলব কী সাহায্য চাই। আর হ্যাঁ, একটা কথা আগেই বলে রাখি। তুমি কোনও বিশ্বস্ত জায়গার কথা জানো, যেখান থেকে আসবাবের জন্য ভালো কাঠ কেনা যেতে পারে? সমুর বিয়ের আগে ওর ঘর ভালো করে গুছিয়ে দিতে চাই।”
কিছুক্ষণ থেমে মালতী শেষ এবং মোক্ষম কথাটি বলেন।
“তোমার স্যার থাকলে যেমনটা চাইতেন, তা-ই চাইছি আমিও।”
সুবলের ভেতরের সেই লোকটা যে সর্বদা উদ্্গ্রীব থাকে মালতীকে খুশি করতে, তাঁর মন জুগিয়ে চলতে; সে লেগে পড়ল দক্ষিণ শহরতলিতে ভালো কাঠগোলা খোঁজার কাজে। ব্যাপারটা কঠিন হল না যদিও তার কাছে। দিন দুয়েকের মধ্যেই দু-চার জন পরিচিতকে জিজ্ঞাসা করে সহজেই সুবল পৌঁছে গেল রাখাল সর্দারের কাঠগোলায়। অঞ্চলে রাখালের খুব নাম তা সে বিলক্ষণ বুঝল সেখানে গিয়ে। জায়গাটার কাছাকাছি পৌঁছে রাস্তার পাশের দোকানদারকে জিজ্ঞাসা করতেই সে একবাক্যে দেখিয়ে দিল কোন পথে গেলে পৌঁছোনো যাবে। গোলাটা পুরোনো, দেখেই বোঝা যায় তৈরি হয়েছে বাপ-ঠাকুরদাদার আমলে। আগে হয়তো চারদিক ফাঁকা ছিল, কিন্তু এখন শহর বাড়তে বাড়তে সবদিক থেকে ঘিরে ধরেছে কাঠগোলাটাকে। বেশ বড়ো আকারের গোলাটা পুরোনো দিনের নিশান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ছড়ানো অনেকটা জমির ওপর। প্রথমদর্শনেই সুবল বোঝে এ কাঠগোলার আয়ু আর বেশিদিন নয়। অচিরেই এখানে মাথাচাড়া দেবে আধুনিক বহুতল। কাঠগোলার ভেতরে ঢুকে রাখালের সঙ্গে আলাপ করে সে। তার ইচ্ছা লোকটার সঙ্গে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করা। যাতে, যখন সে মালতীকে বলবে এই জায়গার কথা বা তাকে সঙ্গে করে এখানে নিয়ে আসবে, মালতী যেন তাঁর দিকে সপ্রশংস দৃষ্টিতে চান, মনে মনে ভাবেন, ‘সুবল কাজের ছেলে, সব পারে।’ কাঠগোলায় ঢুকে সুবল রাখাল সর্দারের খোঁজ করে।
প্রথমদর্শনেই লোকটাকে সুবলের অনেক দিনের চেনা বলে মনে হয়! সে এদিকে কস্মিনকালে আসেনি তাই রাখালের সঙ্গে তার আগে কখনও সাক্ষাৎ হওয়ার কোনও সম্ভাবনা ঘটেনি, তা সে জানে। কিন্তু তবুও দূর থেকে তার দিকে এগুতে থাকা লোকটাকে বড্ড চেনা চেনা ঠেকে সুবলের। গত দশ বছর সে দিনের-পর-দিন ঘুরে বেড়িয়েছে বিভিন্ন জায়গায়, ভিড়ের মধ্যে খুঁজেছে বিশেষ একজনকে, কিন্তু সে নিশ্চিত এ লোকটাকে সে অমন কোনও জায়গায় দেখেনি। তবে এত চেনা ঠেকছে কেন, সুবল ভাবে নিজের মনে। রাখাল এসে দাঁড়ায় তার সামনে, জিজ্ঞাসা করে কী কাজে সুবল এসেছে তার কাছে। সুবলের কাজ সামান্য। সে আজ আলাপ করে যেতে চায় লোকটার সঙ্গে যাতে যেদিন মালতীকে নিয়ে আসবে এখানে, লোকটা যেন তার সঙ্গে সেদিন চেনা মানুষের মতো ব্যবহার করে।
“আমাদের বাড়িতে সামনেই বড়ো অনুষ্ঠান তাই কিছু আসবাব তৈরির জন্য ভালো কাঠ কিনতে চাই। আপনার এই গোলার কথা খুব শুনেছি, আজ ভাবলাম একবার স্বচক্ষে দেখে যাই।”
সুবলের কথা শুনে রাখাল জবাব দেয় না, স্মিতহাস্যে সে সুবলের তারিফের প্রত্যুত্তরে নিঃশব্দে মৃদুভাবে মাথা নাড়ে। আলাপ জমানোর জন্য সুবল লোকটাকে আরও একটু বুঝতে চায়। তা ছাড়া তার ধন্দ কাটছে না। এ লোককে সে কখনও আগে দেখেনি সে সম্বন্ধে সে নিশ্চিত, তবে লোকটার চেহারায় কিছু-একটা আছে যা তার গভীরভাবে চেনা। মনে মনে একটা জুতসই বাক্য খোঁজে সুবল যাতে আরও কিছুক্ষণ এখানে থেকে লোকটার সঙ্গে একধরনের সখ্য তৈরি করা যায়।
“আপনার এই গোলা নিশ্চয়ই অনেক দিনের, কয়েক পুরুষ ধরে চলছে বলে মনে হয়। আপনি একাই চালান নাকি বাড়ির আরও লোকজন আছেন এই কাজে আপানার সঙ্গে?”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে সুবল লোকটার মুখ থেকে কোনও উত্তর না শুনতে পেয়ে একটু মরিয়া হয়ে আলোচনাটাকে অন্য দিকে নিয়ে যেতে চায়।
“তবে এদিকে আজকাল জমির তো খুব দাম! আর এতবড়ো জমি একলপ্তে এমন জায়গায় পাওয়া মানে হাতে চাঁদ পাওয়া! আপনার আর গোলা চালিয়ে কী কাজ, ফ্ল্যাটবাড়ি বানিয়ে বেচে দিলেই তিনপুরুষ বসে খেতে পারবে।”
সুবলের শেষ বাক্যটি শুনে রাখালের ভাবান্তর হয়। তার নিঃস্পৃহ ভাবটা কেটে যায়। সে সুবলের দিকে দু-চোখ মেলে গভীরভাবে চেয়ে থাকে কিছুক্ষণ। নিজের বাম হাত দিয়ে মাথার পাতলা হয়ে আসা চুলে বিলি কাটে ধীরগতিতে। কথা বলার সময় লোকটার দু-হাত আন্দোলিত হয় এক বিশেষ ছন্দে। সহসা তাকে দেখে সুবল বোঝে কেন তার এই লোকটাকে চেনা ঠেকছিল প্রথমদর্শন থেকেই। লোকটার দৃষ্টি আর ওই বাম হাতের বিশেষ ব্যবহার; এসবই তার বিশেষ চেনা। অবশেষে সে রাখালের কণ্ঠস্বর শোনে। নিজের দুই হাত নাড়িয়ে রাখাল তাকে চারপাশ দেখিয়ে কথা বলে। বিশেষভাবে গোলার এককোনায় পড়ে থাকা বড়ো বড়ো কাঠের গুঁড়ির দিকে সে সুবলের নজর আকর্ষণ করে।
“এই কাঠগোলা শুরু করেন আমার ঠাকুরদা, বুঝলেন। আপনি যদি প্রোমোটার বা জমির দালাল হন তবে আমার সঙ্গে কথা বলে লাভ নেই। আমি এই গোলা বন্ধ করতে চাই না।”
একটু চুপ থেকে রাখাল আবার বলা শুরু করে।
“হ্যাঁ, তবে আমার বাড়িতে সকলে আপনার মতোই ভাবে। বউ, ছেলেরা…সবাই। তাই যদি জমির সন্ধানে এসে থাকেন তবে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখাই ভালো। আজ নয় তো কাল আপনার মনস্কামনা পূর্ণ হবে নিশ্চয়ই।”
রাখালের এমন একটা কথায় সুবল বিচলিত হয়। সে শুধু চেয়েছিল লোকটার সঙ্গে পরিচিত হতে। দু-পা এগিয়ে গিয়ে সুবল অচেনা লোকটার হাত ধরে নিজের দু-হাত দিয়ে। নিজের হাবেভাবে ভেতরের অনুভূতি বোঝাতে চায় তাকে। সে স্থির জানে অজান্তেই সে রাখালকে আঘাত করে ফেলেছে নরম জায়গায়। ধীরে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে রাখাল আবার কথা বলে। তার চোখ এখন ওইসব কাঠের গুঁড়িতে নিবদ্ধ।
“আর ওই যে দেখছেন সার দিয়ে রাখা কাঠের গুঁড়িগুলো, ওগুলো একদিন সব গাছ ছিল। বড়ো বড়ো গাছ, অফুরন্ত প্রাণ ছিল তাদের মধ্যে। জ্যান্তজীবন্ত সব গাছ, আপনার-আমার মতো। মানুষদের মতো। ওই গুঁড়িগুলো সেইসব একদা বেঁচে থাকা গাছেদের মৃতদেহ। সে অর্থে এ জায়গাটা একটা মৃতদের সরাইখানাও বটে। কেটে-চিরে ফাল ফাল হয়ে যাওয়ার আগে একটু বিশ্রাম নিতে পারছে ওরা, এই-বা কম কী।”
রাখালের এমনতর কথায় সুবল ভেঙে পড়ে নিজের ভিতরে। আজ অনেক দিন পর আবার একবার নিজের ভিতরে স্যারের মুখে কখনো কখনো অস্ফুটে শোনা সেই দিঘিটা দেখতে পায়। আদিগন্তবিস্তৃত জলের ধারে দাঁড়িয়ে আছে সার সার মহীরুহ, জ্যান্তজীবন্ত। তার মনে হয় সেইসব গাছেরাই হয়তো মৃত্যুর পর এখানে এসেছে, দু-দণ্ড বিশ্রাম নিতে। ইশারায় বিদায় নেয় সে রাখালের থেকে। মনে জটিল সব প্রশ্ন নিয়ে সুবল এবার ফিরতি পথ ধরে। রাখাল চেয়ে থাকে তার অপস্রিয়মাণ অবয়বের দিকে, যতক্ষণ না সে রাস্তার বাঁকে মিলিয়ে যায়।
॥ পাঁচ ॥
গত কয়েক দিন কারণে-অকারণে তার বেশ কয়েক বার কথা হয়েছে মালতীর সঙ্গে। প্রথম বার কথা হয় তাঁকে জানাতে রাখালের ব্যাপারে। সুবল মালতীর প্রশংসা পেতে চায়, তাই সে খানিকটা সত্যি-মিথ্যে মিলে গল্প
খাড়া করে।
“আমার অনেক দিনের পরিচিত, আপনাদের বাড়ি থেকে যে খুব-একটা দূর, তা-ও নয়। ওই কাছেই। অনেক দিনের কাঠগোলা ওদের, সেই ঠাকুরদার আমল থেকে চলছে। ভালো, বিশ্বাসী লোক আর তা ছাড়া আমার পূর্বপরিচিত, নেহাতই বন্ধু মানুষ। আপনাকে ঠকাবে না ম্যাডাম।”
সুবলের কথায় মালতী আশ্বস্ত হয়েছিলেন, বলেছিলেন তিনি ছুতোর মিস্ত্রির থেকে কাঠের মাপজোক বুঝে রাখবেন শীঘ্রই। তারপর নয় একদিন সুবল এসে তাঁকে নিয়ে যাক। পরের দিন কয়েকে সুবল বার কয়েক ফোন করেছিল– মালতী কাঠের বিভিন্ন মাপ জানতে পেরেছেন কি না তা জানতে। আর গতকাল সে ফোন করেছিল কবে আবার সে আসবে তঁার বাড়িতে সেই কথা জেনে নিতে। প্রত্যেক বারই দরকারের চেয়ে বেশি সময় ধরে নানা অর্থহীন কথা বলেছে সুবল। কথাশেষে ফোন নীরব হয়ে যাওয়ার পর তার মনে যুগপৎ গ্লানি আর উত্তেজনা জন্মেছে। তবে আজ তার ভিতরে শুধুই উত্তেজনা! এতদিন পর আবার সে গিয়ে দাঁড়াবে বাগান-ঘেরা দোতলা বাড়িটার দরজায়। সুবল বোঝে পুরোনো দিনের মতো আজও বুকটা ঢিবঢিব করছে তার। অভ্যাসমতো সুবল ডান হাতের তর্জনী আর মধ্যমা দিয়ে আলতো করে অনুভব করে বাম হাতের কবজিতে নাড়ির গতি। তারপর পা চালিয়ে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ায় লোহার গেটের সামনে।
গ্রিলের গেটটা নতুন, সুবল বোঝে। আগের চেয়ে অনেক বড়ো আর উঁচু। দেখলে একটু সম্ভ্রম জাগে মনে। পাঁচিলও সারিয়ে-সুরিয়ে এখন নতুন চেহারা পেয়েছে। আর বাড়িখানা তো চেনাই যাচ্ছে না! নতুনভাবে রং করা হয়েছে সদ্য সদ্য। আগে এই বাড়ির গায়ে আলতো করে লেগে থাকত একধরনের বিষণ্ণতা। বাড়িটাকে বড্ড নিঝুম-একাকী মনে হত সুবলের। তবে এখন আর তেমনটা নয়। নতুন রঙের ঔজ্জ্বল্য আর নতুন জীবনের হাতছানি বাড়িটাকে বেশ গমগমে করে তুলেছে। গেট পার করে ভেতরে প্রবেশ করে সুবল। চারদিকে তাকিয়ে বোঝে বাগানের যত্ন নেওয়ার লোক আছে এখন। মৃদু হাওয়ায় ভেসে আসা পাকা তেঁতুলের গন্ধ নাকে আসে নিমেষে। সুবল খানিকটা আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে যেন। এতগুলো বছর পার করেও গাছটা বেঁচে আছে, একইরকমভাবে নিজের অস্তিত্ব জাহির করছে ঝাঁজালো মিষ্টি গন্ধে, এতে সুবল বেশ আশ্চর্য হয়। মনে মনে ভাবে, ‘তবে কি কিছুই বদলায় না আসলে?’ সামনে দশ-বারো পা হেঁটে গেলেই বাড়ির সদর দরজা। বহু স্মৃতি-রোমন্থন করতে করতে সুবল গেট থেকে সদর দরজার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। মালতী তৈরি ছিলেন। সুবল আসামাত্র বেরিয়ে পড়তে চাইলেন রাখালের কাঠগোলার উদ্দেশে।
“আব্দুলকে বলেছিলাম, ও এসেছে কিছুক্ষণ আগেই। তাই দেরি না করে কাজটা শেষ করে আসি সুবল। যজ্ঞিবাড়ির কাজ পড়ে আছে। আর মাত্র একটা মাস, তারমধ্যে মেলা কাজ শেষ করতে হবে।”
এতদিন পর মালতীর সঙ্গে দেখা; সুবলের ভিতরে নিজের অজান্তেই অন্যরকমের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। তার তৈরি হওয়া সেই চিত্রনাট্যে তার আর মালতীর নিভৃতে মুখোমুখি বসে গত দশটা বছরের হিসেবনিকেশ করার কথা। সুবল বোঝে গত দশ বছরে মালতী এগিয়ে গেছেন অনেক ঝড়ঝাপটা সামলে, বহু বাধা অতিক্রম করে। হরিপদবাবু এখন অতীত তাঁর জীবনে, সে নিজে শুধু রয়ে গেছে একই জায়গায়।
কাঠগোলায় পৌঁছোনোর পর রাখাল নিরাশ করেনি তাকে। সুবলকে দেখেই সে একগাল হাসল, যেমনটা যে-কেউ পরিচিত মানুষকে দেখলে করে থাকে। আলাপপর্ব শেষ হলে রাখাল মন দিয়ে শোনে মালতীর কথা। তাঁর সঙ্গে
অনায়াস ভঙ্গিতে কথা বলে সে বুঝে নেয় কী ধরনের আসবাব তৈরি হবে মালতীর বাড়িতে। তারপর হঠাৎ কিছু-একটা মনে পড়ে গেছে এই ভঙ্গিতে সে বলে এক বিশেষ গাছের গুঁড়ির কথা যা তার গোলায় সদ্য এসেছে। তার ধারণা মালতী যেসব আসবাব বানাতে চান তার জন্য ওই গুঁড়ির কাঠই সবচেয়ে ভালো হবে।
“কয়দিন আগেই এসেছে মা জননী। একটা প্রকাণ্ড হিজল গাছের গুঁড়ি। এ কাঠে খুব ভালো আসবাব তৈরি হবে।”
ইশারায় গোলার মজুরদের একজনকে ডেকে পাঠায় রাখাল। নির্দেশ দেয় কয়েক দিন আগে আসা ওই বিশেষ কাঠ বার করে নিয়ে এসে করাতকলে চাপাতে। মালতীর দেওয়া মাপজোক অনুযায়ী সেই কাঠের বিভিন্ন টুকরো করে দেওয়ার নির্দেশ দেয় রাখাল। সুবল দেখে রাখালের মুখে হিজল গাছের কথা শুনে মালতী যেন কেমন একটু বদলে যান নিমেষে। খরখরে ভাবটা উধাও হয়ে এক অদ্ভুত মেদুরতা গ্রাস করে মালতীকে। তঁার চোখের দৃষ্টি নরম হয়, কৃশকায় শরীর যেন সজল হয়ে মুহূর্তে। সুবল ভেবে থই পায় না কীভাবে, কোন ম্যাজিকে মানুষ নিমেষে এমন বদলে যায়! এমন সময় হঠাৎ, প্রায় বিদ্যুৎরেখার মতো সুবলের মাথায় ঝলসে ওঠে এক দিঘির চিত্র। আদিগন্তবিস্তৃত কালো গভীর জলের পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে সার সার গাছ। তাদের মধ্যে একটা গাছকে তার যেন চেনা চেনা ঠেকে! ‘ওটাই কি হিজল গাছ?’ ভাবে সুবল। কাঠ কাটা শুরু হলে কাঠের মিহি গুঁড়ো উড়ে আসে তাদের দিকে, একটু একটু করে সেই মিহি কাঠগুঁড়ো ঢেকে দেয় মালতীর অবয়ব।

